জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে অনেক পরিবার। বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম কিছুটা কমলেও মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আরো কিছু সময় অব্যাহত থাকতে পারে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার উপকণ্ঠের শহর তাগুইগের বাসিন্দা এড ডেলোস সান্তোস দীর্ঘদিন ধরে চার সদস্যের পরিবার চালাতে সংগ্রাম করছেন। ৪৫ বছর বয়সী এ নিরাপত্তাকর্মীর মাসিক আয় প্রায় ৩০ হাজার পেসো বা প্রায় ৪৯০ ডলার।
তিনি জানান, গত কয়েক মাসে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ার পর পরিবারের ব্যয় আরো কমাতে হয়েছে। আগে যেখানে এক কেজি মাংস কিনতেন, এখন সেখানে আধা কেজি কিনতে হচ্ছে। তার ভাষায়, বর্তমান আয়ে সংসার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
শুধু ফিলিপাইন নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশেই পড়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ও এর প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে তেল, গ্যাস ও কিছু শিল্প রাসায়নিকের সরবরাহ ব্যাহত হয়। ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের জেরে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো। কারণ এসব দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানি ব্যয় আরো বেড়েছে। যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র সময় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি উঠে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক শান্তি চুক্তির পর তা কমে প্রায় ৭০ ডলারে নেমে আসে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার ক্ষয় দ্রুত কাটবে না।
ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমাত্রা প্রদেশের সোলক শহরের বাসিন্দা নুরাফনিয়া জানান, চলতি বছরের শুরু থেকেই ডিম, মুরগি ও গরুর মাংসের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যের দাম বাড়ছিল। ১০ জুন রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি পেরতামিনা জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে পড়ে।
খুচরা বিক্রেতার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভোক্তারা এখন ব্যয় কমানোর পথে হাঁটছেন। তারা আগের তুলনায় কম দামের পণ্য কিনছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছেন।
ফিলিপাইন অ্যামালগামেটেড সুপারমার্কেটস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি স্টিভেন কুয়া বলেন, ‘অনেক পরিবার এখন শুধু মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছে। তারা মাঝারি দামের ব্র্যান্ড, আলাদা প্যাকেটের বেকারি পণ্য এবং দুগ্ধজাত পানীয় কেনা কমিয়ে দিয়েছে।’
ইন্দোনেশিয়ান রিটেইলার্স অ্যান্ড শপিং সেন্টার টেন্যান্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান বুদিহারজো ইদুয়ানসজাহ বলেন, ‘নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা এখন অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের পণ্য কিনছেন অথবা কম পরিমাণে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।’
ফিলিপাইনে গত মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এপ্রিলে তা ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এক বছর আগে একই সময়ে এ হার ছিল ১ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ায় একই মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা এপ্রিলে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
উচ্চ আয়ের দেশ সিঙ্গাপুরও এ পরিস্থিতির বাইরে নয়। দেশটির অর্থনীতি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও ক্রয়ক্ষমতা কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সিঙ্গাপুর ডলারের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকলেও দেশটিতে মানুষের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগ জানায়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সম্পদের প্রবৃদ্ধির তুলনায় দেনার প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। টানা দুই প্রান্তিকে এ প্রবণতা দেখা গেছে। এদিকে থাইল্যান্ডে টানা ১২ মাস মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক থাকার পর এপ্রিলে তা বেড়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়। মে মাসে সামান্য কমে ২ দশমিক ৮ শতাংশ হয়। ভিয়েতনামেও মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে, যা ২০২০ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ।
এছাড়া মালয়েশিয়ায় মে মাসে মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।